আন্দোলন ও নির্বাচন দুই প্রস্তুতি বিএনপিতে

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা : দুই চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে আগামী জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বিএনপি। সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যেই একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ইতিমধ্যে তেমন ইঙ্গিতও দিয়েছে সরকার। দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করা ও নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়কে কেন্দ্র করে কৌশল চূড়ান্ত করেছে বিএনপি।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ক্ষমতাসীন মহাজোটের বাইরে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার বিকল্প নেই এমনটাই মনে করেন বিএনপির নীতি নির্ধারকরা। বিএনপিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি। ১লা সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশ থেকেও জাতীয় ঐক্যের আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করেছেন দলটির নেতারা। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে এই প্রক্রিয়াটির একটি দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্যণীয় হবে।

আর সেটার উপর নির্ভর করছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দাবি আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম ও নির্বাচন মোকাবিলায় (অংশগ্রহণ কিংবা প্রতিরোধ) বিএনপি’র কৌশল ও সার্বিক প্রস্তুতি। অদূরদর্শী কোনো কর্মসূচির মাধ্যমে এবার হুট করে রাজপথ উত্তপ্ত করবে না বিএনপি। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আলোচনার পথে হেঁটে প্রয়োজনে চারদিক গুছিয়ে কার্যকর কর্মসূচির মাধ্যমে দলটি যাবে স্বল্পমেয়াদি আন্দোলনে। বিএনপি’র এমন মনোভাবের কথা জানিয়েছেন দলটির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা।

আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে কারাগারে সাক্ষাৎ করতে গেলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের কয়েকটি বার্তা দিয়েছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সেখানে তিনি দল ও জোট ঠিক রাখা, আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি রাখা, সরকারের ফাঁদে পা না দেয়ার যে বার্তা দিয়েছেন তা মেনেই সবকিছু এগিয়ে নিচ্ছেন দলটির নেতারা।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিটি জোরদার করতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে বিএনপি। তাদের তরফে ইতিবাচক সাড়াও মিলেছে। তফসিল ঘোষণার আগে তাকে মুক্তি দেয়া না হলে রাজপথের কর্মসূচি দেবে বিএনপি।

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়ে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে সে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কয়েক বছর আগেই একাধিক সমাবেশ থেকে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন আহ্বানটির ব্যাপক সাড়া মেলেনি। কিন্তু বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির বেশ কয়েকজন নেতা এ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন। দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়াটি জোরদার হয় দুই বড় জোটের বাইরে।

বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ও ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরাম একাধিক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে একমত হয়ে বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দেন। বিএনপি এ ঐক্যপ্রক্রিয়াকে প্রথম থেকেই পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। ফলে ঐক্যের ডাক পেয়ে ১০ দফার মাধ্যমে দ্রুতই সাড়া দেয় বিএনপি।

অন্যদিকে সিপিবি’র নেতৃত্বে বামপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক দলও একটি জোট গঠন করেছে। যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম নেতাদের পাশাপাশি কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ প্রক্রিয়াটিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। ওদিকে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের শরিক জামায়াতসহ স্বাধীনতাবিরোধী কিছু রাজনৈতিক দলকে বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়া যুক্ত করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম। এ নিয়ে জোটের অভ্যন্তরে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনেও কাজ করছে বিএনপি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে গণফোরাম আয়োজিত সমাবেশটিতে বিএনপি’র অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের কৌশলেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। জোট ঠিক রেখেই এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি কদম ফেলবে দলটি। নেতারা জানান, ঐক্যপ্রক্রিয়ায় বিএনপি’র অবস্থান নিয়ে কিছু গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল রাজনৈতিক মহলে। তবে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশটি সে গুঞ্জন উড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি দু’টি বার্তা দিয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বার্তা দু’টি হচ্ছে- প্রথমত, ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত রয়েছে বিএনপি।

দ্বিতীয়ত, জাতীয়তাবাদের মূল শক্তিই হচ্ছে বিএনপি। নেতারা বলেন, দেশের মানুষের কাছে বিএনপি’র শক্ত জনভিত্তি রয়েছে আর সেটাকে কার্যকর করতে প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের সহায়তা। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের বার্তা দিয়েই বৃহত্তর ঐক্য চাইছে বিএনপি।

সেটা হলে- দাবি আদায়, নির্বাচন মোকাবিলা, সরকার গঠনের বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে সামনে আসবে। তাই বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়াকে জোরদার করবে সংশ্লিষ্ট দলগুলোসহ সমমনা রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাবে বিএনপি।

নেতারা জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে বিএনপি’র কার্যক্রম। ইতিমধ্যে বিএনপি ও বেশির ভাগ অঙ্গসংগঠনের জেলা ও মহানগর কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই অঙ্গদলগুলোর পুনর্গঠন সম্পন্ন করা হবে। সেই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরে পদ-পদবি বা অন্যান্য কারণে সৃষ্ট দূরত্ব ও কোন্দল নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে দলের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা এ নিয়ে কাজ করছেন। এছাড়া বিগত এক দশকে নানা অভিযোগে দলের যেসব নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের একটি উদ্যোগও নিয়েছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

ইতিমধ্যে তার নির্দেশনা অনুযায়ী বহিষ্কৃত নেতাদের ও একাধিক কমিটির ঝামেলাযুক্ত সাংগঠনিক ইউনিটগুলো দু’টি পৃথক তালিকা তার কাছে পাঠিয়েছে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর। নেতারা জানান, দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের আলোচনা অনুযায়ী কাছাকাছি সময়ে একটি জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক ডাকার নীতিগত সিদ্ধান্তও রয়েছে। আর দলের সাংগঠনিক বিষয়াদি ও সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্তগ্রহণে কেন্দ্রীয় নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ধারাবাহিক বৈঠক করবেন। আন্দোলন ও নির্বাচন ইস্যুতে জোট নেতাদের সঙ্গেও ধারাবাহিক বৈঠক করবে বিএনপি। এছাড়া আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের দাবি জোরদার করতে বাংলাদেশে নিযুক্ত কূটনীতিকদের সঙ্গেও দফায় দফায় বৈঠকে বসবেন দলটির নেতারা।

বিএনপি নেতারা জানান, আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাবে সমান্তরালে। এজন্য সাবেক এমপি-মন্ত্রী ও মনোনয়ন প্রত্যাশীদের এলাকায় সময় দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে দলের হাইকমান্ড। যাতে নির্বাচন কিংবা আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘যিনি নির্বাচন করবেন, তাঁর তো বসে থাকার সুযোগ নেই। নির্বাচন করলে যেমন সম্ভাব্য প্রার্থীকে নিজের মাঠ গুছিয়ে রাখতে হবে, আবার না করলেও তাঁকে প্রতারণার নির্বাচন রুখে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি রাখতে হবে।’ পাশাপাশি দলের তরফে এবং শুভাকাঙক্ষীদের নিয়ে এলাকা এবং প্রার্থী জরিপও চালিয়ে যাবে বিএনপি। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে যেন প্রার্থী নির্বাচনে জটিলতা তৈরি না হয়। সেই সঙ্গে আগামীতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য হলে কোন কোন আসন ছাড় দিতে হতে পারে সেইসব বিষয়টি নিয়েও কাজ করছেন দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন নেতা।

তবে এর সবকিছুই হচ্ছে, গোপনে। নেতাদের যাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার বাইরে অন্য বিষয়ে খুব বেশি জানতে পারছেন না তিনি। আর সবকিছুই সমন্বয় করছেন লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পাশাপাশি দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়াকেও অবহিত করা হচ্ছে প্রতিটি পদক্ষেপ।

বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে কার্যকর আন্দোলন ছাড়া বর্তমান সরকারের কাছ থেকে কোনো দাবি আদায় হবে- এমনটা বিশ্বাস করেন না বিএনপি নেতারা। তারা বলেন, জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি একটি দৃশ্যমান রূপ পেলেই প্রথমে আলোচনা ও পরে আন্দোলনের পথে হাঁটবে বিএনপি। তবে আন্দোলনের পথযাত্রা শুরু হবে তফসিল ঘোষণার পরে। বিশেষ কোনো ইস্যুতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হলে যুগপৎ আন্দোলনের বিকল্প পথও খোলা রাখছে বিএনপি। নেতারা জানান, দিন-তারিখ নির্ধারণ করে নয়, সরকারের চেহারা ও আচরণের ওপর নির্ভর করবে আন্দোলনের ধরন ও কৌশল।

তবে আন্দোলন হবে কার্যকর কর্মসূচির মাধ্যমে জোরালো কিন্তু স্বল্পকালীন। জাতীয় নির্বাচনের তফসিলকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটতে পারে। সেটা হতে পারে অক্টোবরে। ফলে সেপ্টেম্বরকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের দৃশ্যমান পথচলার মাস ধরে অক্টোবরকে (সম্ভাব্য তফসিল ঘোষণার পর) টার্গেট রেখেই সব প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। সুত্র : মানবজমিন