প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১:১৬:৪৭

চট্টগ্রামে লটারির ফাঁদে নিঃস্ব নগরবাসী

ctg-pic (1)
চট্টগ্রাম :
লটারি নয় যেন মরণ নেশার ফাঁদ। তরুণ থেকে বৃদ্ধ এমনকি ছোটরাও বাদ যাচ্ছে না এই লটারির ফাঁদ থেকে। পুরস্কারের লোভে সব শ্রেণির মানুষ কিনছে লটারি। আর প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রভাবশালী চক্র।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থার ব্যানারে চলছে লটারির এই ঠকবাজির ব্যবসা। চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গা থানার র‌্যাব-৭ কার্যালয়ের পাশে পরিত্যক্ত বিশাল জমিতে গত একমাস ধরে পণ্য মেলার আড়ালে চলছে এই লটারি ও জুয়ার আসর।
যা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেয় প্রশাসনের।

স্থানীয় লোকজন জানান, ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই পতেঙ্গায় শুরু হয় এই মেলা। মেলায় পণ্য বেচাকেনা তেমন না থাকলেও সারাক্ষণ চলে জুয়ার আসর ও লটারি বেচাকেনা। প্রতিদিন এক হাজার রিকশা দিয়ে নগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে বিক্রি চলছে এসব লটারি।

প্রতিদিন ড্র হওয়ায় সাধারণ মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছে এ লটারির প্রতি। ফলে এই লটারি দেদারছে কিনছে নিম্ন আয়ের মানুষ ও পোশাক শ্রমিকরা। তাদের একটাই আশা-‘যদি লাইগ্যা যায়, তাহলে লাখপতি। কিন্তু সাধারণ মানুষের লটারি কোনোদিন লাগেনি। লাখপতিও হয়নি কেউ।

ctg-1

লোকজন জানায়, এ লটারির প্রথম পুরস্কার ৩০ লাখ, দ্বিতীয় পুরস্কার ১০ লাখ, তৃতীয় পুরস্কার ৫ লাখ টাকা। এভাবে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা দামের বালতি পুরস্কারও রয়েছে। এরমধ্যে পুরস্কার হিসেবে যে ক’জন পেয়েছেন-ওই বালতিই। যা লোক দেখানো। এই দেখাদেখি আর লাখ টাকা পুরস্কারের লোভে চোখ বন্ধ করে লটারি কিনছে সাধারণ মানুষ। আর দিনের শেষে খালি পকেটে বাড়ি ফিরছে বেশিরভাগই।

সরজমিন কথা হয় রিকশাচালক মুহাম্মদ রফিক মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, গত মাসে আমি বাড়িতে টাকা পাঠালাম ছেলেমেয়েদের জন্য। এই মাসে পাঠাতে পারবো না। কারণ লটারি ফাঁদে পড়ে আমার সব শেষ। রিকশাটাও বিক্রি করে দিয়েছি। এখন ডেইলি কাজ করছি।

কর্ণফুলী ইপিজেডের পোশাক কারখানায় কাজ করেন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, এ মাসের ৭ তারিখে বেতন পেয়ে সব টাকা লটারির পেছনে ঢেলেছি। কিন্তু কিছুই পেলাম না। বাড়িতে কোনো টাকা পয়সা দিতে পারিনি। আমার মতো আরো অনেকেই এ ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব।

তারা বলেন, প্রতিবন্ধীর নাম বিক্রি করে এই ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা’ চট্টগ্রামের ব্যানারে জমজমাট ব্যবসা চালাচ্ছে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী। তারা প্রতিদিনই লটারির ড্র’র টোপ দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছে। যাদের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় সরকার দলীয় লোকজন ও পুলিশ প্রশাসন।

তারা জানান, প্রতিটি লটারির মূল্য ২০ টাকা। প্রতিদিন লাখখানেক লটারি বিক্রি হয় যা পুরোটাই ঢুকে স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনের পকেটে। বাকি অংশ যায় মেলা আয়োজন কমিটির ফান্ডে। আর লটারির টাকা জোগাতে উঠতি তরুণ সমাজ জড়িত হয়ে পড়ছে চুরি-ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইয়াবা বিক্রিসহ নানারকম মাদকদ্রব্য বেচাকেনায়। এ নিয়ে নিম্ন আয়ের লোকজনদের মধ্যে পারিবারিক কলহও বাড়ছে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মাসুদ বলেন, প্রতিবন্ধীদের সাহায্যার্থে এই মেলার আয়োজন। লটারিও বিক্রি করছি। প্রতিদিন লাখখানেক লটারি বিক্রি হচ্ছে। মানুষ পুরস্কারও পাচ্ছে। এতে সমস্যার কিছুই দেখছি না।

লটারি বিক্রির অনুমোদন আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেলার অনুমোদন আছে। লটারি বিক্রির অনুমোদন না থাকলেও সবার সহযোগিতায় লটারি বিক্রি করছি। লাভবান হচ্ছি, তাতে আপনার ক্ষতি কি?

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, মেলা হলেও এখানে দোকানপাট তেমন নেই। জুয়ার আসর আর লটারি বিক্রি জমজমাট। মেলার নামে জুয়া ও লটারির মাধ্যমে সুকৌশলে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে নিঃস্ব করছে সাধারণ মানুষকে। স্থানীয় প্রশাসনকে এ ব্যাপারে বেশ কয়েকবার জানানোর পরও কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম মহানগরের উপ-পুলিশ কমিশনার (বন্দর জোন) হারুনুর রশিদ হাজারী বলেন, মেলার বিষয়টি আমার নলেজে আছে। কিন্তু লটারি বিক্রির বিষয়টি জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখছি আমি।

চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার জসিম উদ্দিন বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থার ব্যাপারে মেলার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কিন্তু লটারি বিক্রির কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি। বিষয়টি জেনে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানান তিনি। সুত্র : মানবজমিন