থানার জমির মালিকানা ফিরে পেলো ৪১ বছর পর!

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | সিটিজিসান.কম

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার ৭ শতাংশ জমির মালিকানা ফিরে পেতে আদালতেই গত হয়েছে দীর্ঘ ৪১ বছর। এরমধ্যে নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত দৌড়াতে হয়েছে ওই থানায় দায়িত্বরত বিভিন্ন সময়ের অফিসার ইনচার্জদেরকে (ওসি)। তবে শেষ পর্যন্ত বাদির কূটচাল ও প্রতারণা আদালতে স্পষ্ট হওয়ার পর মঙ্গলবার ওই জমির নিরঙ্কুশ মালিকানা ফিরে পায় থানা।

এবিষয়ে সাতকানিয়া থানার পক্ষের (বিবাদীপক্ষের) আইনজীবী মো. সোলায়মান হোসেন ও অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রফিকুল হোসেন এই খবর নিশ্চিত করেন।

আইনজীবী মো. সোলায়মান হোসেন বলেন, সাতকানিয়া থানার রূপকানিয়া ১’শ ৬১ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় সাতকানিয়া থানা। ওই ১’শ ৬১ শতক জমির মধ্যে রূপকানিয়া মৌজার আর.এস ১৬২৮ খতিয়ানের ৫০ ও ৫১ দাগে ১৫৪ ও ৭ শতাংশসহ সর্বমোট ১’শ ৬১ শতক। ৫১ দাগের পশ্চিমাংশে খতিয়ানের ৫০ নং দাগের ১৫৪ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠিত সাতকানিয়া থানা ও সাতকানিয়া সার্কেলের প্রশাসনিক এবং আবাসিক ভবন সমূহ। আর ৫১ দাগের ৭ শতাংশ পূর্ব দিকে অবস্থিত। আর এ আর.এস খতিয়ানে এটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এর থানা হিসাবে চিহ্নিত আছে। তবে থানার পূর্বাংশে ভোয়ালিয়া পাড়া সাকিন সংলগ্ন।

আইনজীবী মো. সোলায়মান হোসেন বলেন, বিগত সত্তর দশকের শেষের দিকে তৎকালীন প্রভাবশালী জামায়াত নেতাদের সহায়তা ও আশীর্বাদ নিয়ে ভোয়ালিয়া পাড়া সাকিনের জনৈক মদন মিয়া কিছু ভূয়া কাগজপত্র সৃজন করে সাতকানিয়ার তৎকালীন ১ম মুন্সেফি আদালতে একটি মামলা করেন। সেসময় থানা পুলিশের ৫১ দাগের এ ৭ শতাংশ জমি তার নিজের বলে দাবি করে টিএস নং-৮৫/১৯৭৭ মামলা দায়ের করেন।

সে মামলার প্রতিপক্ষ তৎকালীন সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ পুলিশ বিভাগীয় অনুমতি ও আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে মামলার প্রদানের পূর্বেই রাজনৈতিক দাপটে মদন মিয়া আদালত থেকে অতি দ্রুত এক তরফা ডিক্রি হাসিল করেন। পরে সেই ডিক্রি রহিতের দাবিতে থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ সাতকানিয়া থানা মিচ-১১৫/১৯৭৭খ্রিঃ নং মামলা দায়ের করেন। এ মামলা করার পর বিভিন্ন তারিখে শুনানি শেষে ১৯৮০ সালের ৩০ জানুয়ারি দোতর্ফা সূত্রে ডিসমিস হয়। আর রায়টি আসে থানার পক্ষে।

কিন্তু চৌকস মদন মিয়া চৌধুরী (অপর-৮৫/১৯৭৭খ্রিঃ) মামলা রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের জেলা জজ আদালতে অপর-আপিল-৫৪/১৯৮০খ্রিঃ মামলা দায়ের করেন। সেই অপর আপিল-৫৪/১৯৮০খ্রিঃ মামলাটিও দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৯৯৪ সালের ৫ জুলাই আপিল খারিজ হয়ে যায়। তাতেও ক্ষান্ত হননি মদন মিয়া। চলে যান হাইকোর্টে। সেই মদন মিয়া চৌধুরী অপর আপিল-৫৪/১৯৮০খ্রি. মামলার রায় ডিক্রির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন-৩৬২/১৯৯৪খ্রি. মামলা দায়ের করেন। সেখানেও দীর্ঘ শুনানিতে চলে যায় প্রায় দেড় যুগ। ২০১২ সালের ২ সেপ্টেম্বর দোতরফা সূত্রে মামলাটি খারিজ হয়ে ফের থানার পক্ষে আদেশ হয়।

এর মধ্যে না ফেরার দেশে চলে যান মদন মিয়া চৌধুরী। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর তার ছেলে মো. ফরিদ উদ্দিন হাসান চৌধুরী এসব বিষয়ে অবগত থাকা সত্ত্বেও সমস্ত আদেশ গোপন রেখে ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রফিকুল হোসেনকে বিবাদি করে সাতকানিয়ার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে একটি মিস মামলা দায়ের করেন। মিস মামলা নং-৭৫/১৭।

আর সেই মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সাতকানিয়া থানার আফিসার ইনচার্জ মো. রফিকুল হোসেন তার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এ জমির ভবনে থাকা বাদির ভাড়াটিয়াদেরকে জোরপূর্বক বের করে দেন, ভবনের পাকা দেওয়াল ভেঙ্গে নতুন দরজা বানান, বিদ্যুৎ বোর্ডের মিটার খুলে ফেলেন এবং গোটা ভবনের কাঠামো পরিবর্তন করে ভবনটি থানা পুলিশের দখলে নিয়ে নিয়েছেন। যার কারণে বাদির লক্ষাধিক টাকার ক্ষতিসাধন করেন।

এরপর ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মুন্সেফ আদালত থেকে হাইকোর্ট বিভাগের যাবতীয় আদেশ ও ডিক্রি কপি সংগ্রহ সেই মামলার চ্যালেঞ্জ করেন ওসি। আর সেই মামলায় দীর্ঘ শুনানি শেষে সাতকানিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল আদালতের বিচারক মো. ইয়াছিন আরাফাত পর্যবেক্ষণ পূর্বক দোতরফা সূত্রে ৯ অক্টোবর মঙ্গলবার মিস মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন।

আদালত সূত্র জানা গেছে, মামলার পর্যবেক্ষণে বিচারক উল্লেখ করেছেন, সমস্ত বিষয়াদি প্রার্থিক (বাদি) সম্পর্ণরূপে অবগত আছেন। অথচ আদালতকে ভ্রমে ফেলার কু-উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় লাভের আশায় অত্র মিস মামলা দায়ের করেন। ফলে আদালতের প্রচার মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। প্রার্থিকের উদ্দেশ্যমূলক উক্তরূপ আচরণের কারণে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। উক্তরূপ আচরণ আদালত অবমাননার শামিল। শুধুমাত্র ন্যায় বিচারের খাতিরে প্রার্থিককে উক্তরূপ অন্যায় আচরণের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ হতে অব্যাহতি দেয়া গেল। প্রার্থিকের মামলা অচল ও অরক্ষণীয় মর্মে আদালত কর্তৃক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’

এই আদেশের মাধ্যমে দীর্ঘ ৪১ বছর পর সাতকানিয়া থানা পুলিশ ৭ শতক রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নিরঙ্কুশ অধিকার ফিরে পায়। এই মামলায় থানার পক্ষে প্রায় ৩০ জন আইনজীবী লড়াই করেন।

সিএস/সিএম

Leave a Reply