জঙ্গি টার্গেট : আতঙ্কে চট্টগ্রামের আইনজীবীরা!

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট। সিটিজিসান.কম

চট্টগ্রাম: শুক্রবার দিনগত রাতে চট্টগ্রামের মিরসরাইর জোরাগঞ্জের আস্তানাগাড়া জঙ্গিদের টার্গেট ছিলো চট্টগ্রাম আদালত ভবন উড়িয়ে দেয়া, এমন খবর জানার পরই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন চট্টগ্রামের আইনজীবীরা। চট্টগ্রাম আদালত ভবন, আইনজীবীদের চেম্বার ও আদালত পাড়ার অরক্ষিত চিত্র তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে আত্মনাদ করে চলেছেন আইন পেশায় জড়িত থাকা এসব আইন কর্মকর্তারা।

জেলার আইনজীবী শীর্ষ সংগঠন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি শীর্ষ কর্তা থেকে শুরু করে সদ্য যোগদেয়া সদস্য সবাই র‌্যাবের পক্ষ থেকে খবরটি শোনার পর থেকে যে যারমতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিজের ফেইসবুক ওয়ালে স্ট্যাটাস দিয়ে আদালত ভবন, আইনজীবীদের চেম্বার ও আদালত পাড়ায় নিরাপত্তা জোরদারে সবগুলো প্রবেশ দ্বারে তল্লাশি চৌকি বসানোর দাবী জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আদালত পাড়ায় ভাসমান ফেরীওয়ালা, ভবেঘুরে, টোকাই ও ভিক্ষুক প্রবেশ রোধ করার দাবী তুলেছেন।

তাদের ভাষ্য, এসবের আড়ালেই জঙ্গিরা আদালত পাড়ায় প্রবেশ করে নাশকতা ঘটাতে পারে। আবার অনেকে বলছেন, আদালত পাড়ায় গড়ে ওঠা ঝুপড়ি দোকান উচ্ছেদ ও ভবেঘুরে মুক্তকরা। আবার অনেকে আদালত, আদালত আঙ্গিনা, আইনজীবীদের চেম্বার ও আদালত পাড়ার সবগুলো প্রবেশদ্বার চব্বিশ ঘন্টা সিসিটিভির আওতায় এনে আইনজীবী, বিচারক, বিচারপ্রাথী, আদালত কর্মকর্তা, কর্মচারী, এডভোকেট ক্লার্ক, মামলার সাক্ষী সহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরী।

চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী নিজের ফেইসবুকে এক স্ট্যাটাসে লিছেন, জরুরী ভিত্তিতে চট্টগ্রাম আদালত পাড়ায় নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হোক।

আর এই ফেইসবুক স্ট্যাটাসের সাথে সংহতি প্রকাশ করে চট্টগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী ও বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউ-েশনের চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট এডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান লিখেনছেন, পুরো আদালত ক্যাম্পাসকে সিসিটিভির আওতায় এনে আইনজীবী, বিচারক, বিচারপ্রাথী, আদালত কর্মকর্তা, কর্মচারী, এডভোকেট ক্লার্ক, মামলার সাক্ষীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। তিনি আরও লিখেছেন, মূল আদালত ভবনসহ আইনজীবী ভবনে বাদামওয়াালা, ফেরীওয়ালা, ভিক্ষুক প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হোক।

তাছাড়া আদালত কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে স্ব স্ব ড্রেস পরিধান ও পরিচয়পত্র গলায় ঝুলানো বাধ্যতামূলক করা হোক।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে লিখেন, ফেরীওয়ালা এবং ভিক্ষুকরা যখন তখন যেখানে সেখানে ঢুকে পড়ে যা নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য হুমকি। আদালতের স্টাফরা পোষাক না পরার কোনো কারন থাকতে পারে না। জংগীদের আত্মঘাতি বোমা হামলায় পুলিশ কনস্টেবল রাজীব নিহত হওয়ার পর থেকে এসব কথা বলে আসছি। ঢাকার আদালতগুলোতে সিকিউরিটি গেট বসানো হয়েছে প্রত্যেক দালানের মূল ফটকে।

এডভোকেট ফজলুল বারী লিখেছেন, এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

এডভোকেট আসকর আলী সুজন লিখেছেন, স্যার একটা মনের কথা বললেন, ধন্যবাদ।

আর এডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম লিখেছেন, এটা অবশ্যই ভালো একটি প্রস্তাবনা, অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হোক, আর হকার্স মার্কেটের পাশদিয়ে আদালত ভবনের পেছনদিয়ে উঠার রাস্তাটি সম্পূর্ন অনিরাপদ থাকে।

এডভোকেট মাসুদুল আলম লিখেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী, আমরা ইতিপূর্বে বার বার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, মাননীয় সভাপতি মহোদয়কে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ত্বরিত সিদ্বান্ত নেয়া উচিত।

এডভোকেট কাইয়ুম ভূইয়া লিখেছেন, মেইন গেটে চেকপোস্ট বসানো দরকার। ভিক্ষুক, বাদাম বিক্রেতা, ভবঘুরেদের দিয়েও বড় অঘটন ঘটতে পারে। তাই সময় এখন-ই।

এডভোকেট খান মাহমুদ লিখেছেন, খুবই প্রয়োজন। পুরো আদালত পাড়া অরক্ষিত। চেম্বার ভবন ও আশপাশে সিসিটিভি স্থাপন করা সময়ের দাবী। গত সপ্তাহেও আমার চেম্বারের সামনে থেকে জুুতা চুরি হয়েছে। ভিক্ষুক হকার কিভাবে আসে বুঝিনা? তিনি আরও লিখেন, আমি তো যুবক ভিক্ষুকদের ভিক্ষা দেইনা। তাই সুযোগ বুুুঝে ওরা জুতা সেন্ডেল নিয়ে যায়।

এডভোকেট মো. মাহমুদুল ইসলাম লিখেছেন, সি. এম. এম বিল্ডিং এর সামনে থেকে শীঘ্রই হকার উচ্ছেদ এর নিমিত্তে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হউক।

অ্যাডভোকেট আমিন আহমেদ লিটন অন্ততঃ সবগুলো প্রবেশ মুখে তল্লাশি চৌকি বসানো হোক।

এডভোকেট সরোয়ার হোসাইন লাভলু লিখেছেন, একমত স্যার। আর সুচিত্রা মন্নি লিখেছেন, সহমত সিনিয়র। এডভোকেট টিপু শীল জয়দেব লিখেছেন, অতীব জরুরী। এডভোকেট সালাউদ্দিন চৌধুরী রোকন লিখেছেন, এতবার জঙ্গী হামলার পরেও আদালত পাড়া নিরাপত্তাহীন। এডভোকেট আয়েশা ছিদ্দিকা লিখেছেন, সহমত।

খবর নিয়ে জানাগেছে, এ একটি পাহাড় চূড়ায় রয়েছে, মহানগর ও জেলা দায়রা জজ আদালত, রয়েছে, মহানগর ও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, নারী ও শিশু অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, বন ও পরিবেশ আদালত, বিদ্যুৎ এবং অর্থঋণ আদালত। এছাড়াও রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, রয়েছে জেলা ট্রজারী অফিস। রয়েছে চারটি সুউচ্চ ভবনে পাঁচ হাজারের অধিক আইনজীবীদের অবস্থান। পাহাড় চূড়ার বিভিন্ন আদালতের কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন এখানে লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, আমাদের এটা দীর্ঘদিনের দাবী। আমরা বেশ কয়েকবার মৌখিক ও একবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। আগামীকাল আবারও চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিরি পক্ষ থেকে লিখিতভাবে প্রশাসনকে জানাবো। একই কথা বললেন চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নাজিমুদ্দিন।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বিগত দিনের দাবীর প্রেক্ষিতে প্রশাসন আইনজীবী ভবনের প্রবশে দ্বারে একটি গেইট বসিয়েছে। এটা দিয়েই পুরো আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না। তাই পুরো আদালত এলাকা নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আনার জন্য আমাদের চাওয়া ।

তবে আদালত পাড়ার এই নিরাপত্তা হীনতার জন্য আইনজীবীদের দুষলেন চট্টগ্রমের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। তিনি বলেন, ছোট্ট একটা পাড়ার, আর এই পাহাড়ের উপড়ে মহানগর ও জেলা দায়রা জজ আদালত, মহানগর ও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, নারী ও শিশু অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, বন ও পরিবেশ আদালত, বিদ্যুৎ এবং অর্থঋণ আদালত। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, রয়েছে জেলা ট্রজারী অফিস। যার সব কিছু ছোট্ট একটা জায়গার মধ্যে। এর বাহিরেও আইনজীবীরা চার-চারটি বিশাল ভবন তৈরি করেছেন। সেখানে দোকানপাটও তৈরি কওে জট তৈরি করেছেতো আইনজীবীরা। ৫ হাজার আইনজীবীর সঙ্গে আরও অন্তত প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার লোক এমনিতে থাকে। এছাড়া বিচার প্রার্থী! সাধারণ মানুষতো প্রবেশ করবে। একই সঙ্গে এ পাহাড়ে এতবেশি গাড়ী উঠে যার পার্কিংয়ের জায়গা দেয়া যায় না।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা হাইকোর্টের পর চট্টগ্রামের এই আদালত ভবনের অবস্থান। এই বিশাল এলাকায় পুলিশ দিয়ে বেষ্টনীকরে রাখা সম্ভব নয়! তার পরও আদালত ভবনের মূল প্রবেশ পথে পুলিশ সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করে। অনেকগুলো পথ দিয়ে মানুষ চলাচল করে। যা একদিনে বন্ধ করা সম্ভব না। জেলা প্রশাসক বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

সিএস.সিএম