চট্টগ্রামে ভাইরাস সংক্রমণে ত্রিপুরা পল্লীর ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত অর্ধশত

নিজস্ব প্রতিবেদক :  চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড দক্ষিন উদালিয়া সোনাইরকুল গ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অজ্ঞাত ভাইরাস সংক্রমণে ত্রিপুরা পল্লীর এক পরিবারের তিন জনসহ চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

গত ছয় দিনে এই চার শিশুর মৃত্যু হয়। পল্লীতে আরও অর্ধশত শিশু-কিশোর আক্রান্ত রয়েছে। তম্মধ্যে ২২ শিশু-কিশোরকে হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আক্তার উন নেছা শিউলি।

তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার (২১ আগস্ট) থেকে এই রোগে শিশু মারা যেতে শুরু করলেও রোববার (২৬ আগস্ট) সকালে বিষয়টি জানতে পেরেছি। আজ রোববার সকালে এক শিশু মারা যাওয়ার খবর পেলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ত্রিপুরা পল্লীতে যান। এরপর ২২ শিশুকে এনে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করান।

হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু সৈয়দ মোহাম্মদ ইমতিয়াজ উদ্দিন জানান, গত মঙ্গলবার এক পল্লীতে এক শিশু মারা যায়। শুক্রবার মারা যায় আরও দু‘জন। সবশেষ আজ রোববারও একটি শিশু মারা গেছে। এদের মধ্যে তিন শিশু একই পরিবারের।
মারা যাওয়া চার শিশু হলো-অন্ন বালা ত্রিপুরা (৬), অন্ন রায় ত্রিপুরা (৪), সম রায় ত্রিপুরা (২) ও কিশা মনি ক্রিপুরা (৪)।

কিশা মনি ত্রিপুরার পরিবারে আরও তিন জন মারাতœক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে জানিয়ে ডা. আবু সৈয়দ মোহাম্মদ ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, এই তিন জনসহ মোট ২২ শিশুকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের শরীরে জ্বর অনেক বেশি। কারও কারও হালকা জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি, সর্দি আছে। শ্বাসকষ্টও আছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু সৈয়দ মোহাম্মদ ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, এলাকায় গিয়ে জানতে পেরেছি প্রতিটি শিশুই প্রথমে মারাতœক জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। এ সময় তাদের শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে। এক পর্যায়ে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

এসব লক্ষণ থেকে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, কোনো ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। কিন্তু এই ভাইরাস এখনও শনাক্ত করা যায়নি। গুরুতর শারীরিক অবস্থার তিন শিশুসহ পাঁচ শিশুর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় জনস্বাস্থ্য বিভাগে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য কেন্দ্রের একজন প্রতিনিধিও এসেছেন বলে জানান ইমতিয়াজ উদ্দিন।

এদিকে খবর পেয়ে রোববার বিকেলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন প্রতিনিধিসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, সার্বিক বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি, তবে এখনও রোগটা কী, সেটা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। এ জন্য ৫ সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, উদালিয়া ত্রিপুরা পল্লীতে আমাদের একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। গত মঙ্গলবার থেকে শিশুরা মারা যেতে শুরু করলেও এসব পরিবারের কেউ ক্লিনিকেও যায়নি, উপজেলা সদরের হাসপাতালেও আসেনি। এলাকাটা খুবই দুর্গম। সমতল থেকে চার কিলোমিটারেরও বেশি হেঁটে ত্রিপুরা পল্লীতে যেতে হয়।

ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দা তাকিধন ত্রিপুরা, নয়ন বিকাশ ত্রিপুরা, বন কুমার ত্রিপুরভা, পদ্ম কুমার ত্রিপুরা বলেন, পল্লীতে ৫৫ পরিবারে ৪০০ লোকের বসবাস। উপজেলা সদর থেকে কিছুটা দূরবর্তী হওয়ার কারণে কোনো স্বাস্থ্য কর্মী এলাকায় আসেন না।

তারা জানান, মঙ্গলবার সকালে পাড়ার বাসিন্দা রমেস ত্রিপুরার শিশুকন্যা সম রায় ত্রিপুরার শরীরে এক ধরনের গোটা উঠতে শুরু করে। দেড় থেকে দুই ঘন্টার মধ্যে তা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর জ¦র আসে। পরে শিশুটি নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পল্লীতে অর্ধশত শিশু আক্রান্ত রয়েছে বলে জানান তারা।

পল্লীর বাসিন্দা তাকিধন ত্রিপুরা বলেন, ত্রিপুরা পাড়া থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে উদালিয়া কমিউনিটি ক্লিনিক। যেতে হলে পাহাড়, খাল ও ঝিরি ডিঙ্গিয়ে পুরো পথ পায়ে হেঁটেই যেতে হয়। অনেক সময় কঠিন রোগে কেউ আক্রান্ত হলে হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে হয়।