ওয়াসা নয়, বাড়ির রিজার্ভারের পানিতেই জীবাণু

চট্টগ্রাম :
নগরীর আগ্রাবাদ ও হালিশহর থেকে সংগৃহিত ওয়াসার পানিতে জীবাণু পাওয়া যায়নি। তবে বাসা বাড়ির পানির কল ও রিজার্ভারে জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) কে বি আবদুস সাত্তার মিলনায়তনে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের হাতে ওয়াসার পানির নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট তুলে দেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) ল্যাব চট্টগ্রামের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সুমন দাশ এবং পরিচালক মাহমুদা খাতুন স্বাক্ষরিত রিপোর্টে দেখা গেছে, মোট ১৪টি উৎস থেকে ওয়াসার পানি সংগ্রহ করা হয়। তারমধ্যে হালিশহরের ফইল্লাতলী বাজারের খালেদা ভিলার দুটি টিউবওয়েলের পানিতে জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়া ওই ভবনের ওয়াসার সরাসরি লাইনের পানিতেও জীবাণু ছিল না। তবে ভবনের কলের পানিতে ক্লোরিফর্ম ও ফিকাল ক্লোরিফর্ম পাওয়া গেছে ১১শ সিপিইউ।

এছাড়া ইশ্চেরিয়া কোলাইয়ের জীবাণুও পাওয়া গেছে। এই জীবাণু ডায়রিয়া ও কলেরার জন্য দায়ী বলে জানান চিকিৎসকরা। অন্যদিকে আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার আবিদার পাড়ার পেয়ারআলী কুঞ্জে সরাসরি ওয়াসার পানিতে জীবাণু পাওয়া না গেলেও ভবনের কলের পানিতে জন্ডিসের জন্য দায়ী ১১শ সিপিইউ ক্লোরিফর্ম এবং ফিকাল ক্লোরিফর্ম পাওয়া গেছে।

এছাড়া ইশ্চেরিয়া কোলাই জীবাণুর অস্তিত্বও মিলেছে। একই ধরনের ফলাফল এসেছে আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার ১৭নং রোডের ১০৮নং বাড়িতে। এই বাড়ির ইয়াসির আরাফাত নামে একজন বাসিন্দা জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি মারা যান। বাড়িটির সরাসরি ওয়াসার পানিতে জীবাণু পাওয়া যায়নি।

তবে বাড়ির রিজার্ভারের পানিতে ফিকাল ক্লোরিফর্ম ও ক্লোরিফর্ম জীবাণু পাওয়া গেছে ১১শ সিপিইউ। একই সাথে ইশ্চেরিয়া কোলাইয়ের অস্তিত্বও মিলেছে। এছাড়া আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার ২৫/১নং রোডের এফ–২/৪ নম্বর বাড়ির রিজার্ভারে ক্লারিফর্ম ও ফিকাল ক্লোরিফর্ম পাওয়া গেছে ১১শ সিপিইউ এবং ইশ্চেরিয়া কোলাইয়ের জীবাণু পাওয়া যায়। অপরদিকে হালিশহর আবাসিক এলাকার ২ নম্বর রোডের এইচ ব্লকের ১১ নম্বর বাড়ির রিজার্ভার এবং সরাসরি ওয়াসার পানিতে কোনো জীবাণু পাওয়া যায়নি। এছাড়া বাটালি পাহাড় এবং নাসিরাবাদ ওয়াসার রিজার্ভারের পানিতেও জীবাণু পাওয়া যায়নি।

অনুষ্ঠানে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, চসিকের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা আগ্রাবাদ ও হালিশহর এলাকার ১৪টি স্পটের পানির স্যাম্পল পরীক্ষার জন্য বিসিএসআইআরে পাঠায়। তাদের পরীক্ষার রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে ওয়াসার পানিতে জন্ডিসের জীবাণু নেই। তবে সেসব এলাকার কলের পানি ও বাসা বাড়ির রিজার্ভারের পানিতে ক্লোরোফর্ম পাওয়া গেছে।

এছাড়াও ই–কোলাইয়ের জীবাণু পাওয়া যায়। যার কারণে ডায়রিয়া ও কলেরা রোগ হয়। তাই এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে বাসা বাড়ির রিজার্ভার ট্যাংক প্রতি চারমাস পরপর বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে পরিষ্কার করতে হবে। তাহলেই পানিবাহিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে।

রিজার্ভার ট্যাংক পরিষ্কার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসা’র সহকারী প্রকৌশলী ইফতেখারুল্লাহ মামুন বলেন, বাসা বাড়ির রিজার্ভার জীবাণুমুক্ত করতে হলে রিজার্ভারের উপরের ঢাকনা খুলে আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। তারপর রিজর্ভারে অর্ধেক পরিমাণ পানি দিয়ে পূর্ণ করতে হবে এবং ভিতরে একটি সিঁড়ি নামাতে হবে। যার মাধ্যমে ভিতরে লোক নামতে পারে। রিজার্ভারে ড্রেন আউট ভাল্ব বন্ধ রাখতে হবে এবং জীবাণুমুক্ত করার সময় এ পানি যাতে কেউ ব্যবহার করতে না পারে সেইদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

রিজার্ভারের জীবানুমুক্তকরণ রুলস অনুযায়ী রিজার্ভারের প্রতি লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম ক্লোরিন অর্থাৎ ১০০ মিলিগ্রাম ব্লিচিং পাওডার মিশাতে হবে। এইভাবে পুরো রিজার্ভারের আয়তন যেন প্রতি ঘন মিটার বা ১ হাজার লিটার আয়তনের রিজার্ভারের জন্য ১০০ মিলিগ্রাম ব্লিচিং পাউডার হিসেবে পুরো রিজর্ভারের আয়তনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্লিচিং পাউডার দিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, এই ব্লিচিং পাউডার প্রতিবারে দুই কেজি করে একটি ১৫ লিটারের বাকেটে পানি দ্বারা ভালভাবে গুলিয়ে নিতে হবে। তা দুই মিনিট মিশ্রণের পর মিশ্রিত ব্লিচিং পাউডারের দ্রবণ অন্য একটি বালতি বা বাকেট দিয়ে রিজার্ভারে ঢেলে দিতে হবে। এইভাবে প্রতিবারে দুই কেজি করে প্রয়োজনীয় ব্লিচিং পাউডার পানি দ্বারা মিশ্রিত করে রিজার্ভারে ঢেলে দিতে হবে। রিজার্ভারের ভিতর সিঁড়ি দিয়ে একজন লোক নেমে পাম্পের মাধ্যমে হোজ পাইপ দিয়ে পুরো রিজার্ভারের ভিতরের অংশ ব্লিচিং পাউডার যুক্ত পানি ছিটিয়ে দিতে হবে এবং চারঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। এরপর রিজার্ভারের ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত পানি রিজার্ভারের আউটলেট ভাল্ব খুলে বাইরে ফেলে দিতে হবে।

এইভাবে আরো দুইবার বাইরে থেকে পরিষ্কার পানি দিয়ে রিজার্ভারের ভিতরের অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার করে তৃতীয়বারে পানি দিয়ে ব্যবহার করা যাবে। এইভাবে প্রতি চারমাস পরপর আন্ডারগ্রাউন্ড এবং ওভার হেড রিজার্ভার জীবাণুমুক্ত করা হলে গ্রাহক যে পানি পাবেন তা জীবাণুমুক্ত থাকবে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব, শৈবাল দাশ সুমন, চসিক প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরী, চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ুন কবির প্রমুখ।

গত ২৮ জুন আগ্রাবাদা ও হালিশহর এলাকায় জন্ডিসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার ঘটনায় ওই এলাকায় সরবরাহ করা ওয়াসার পানি পরীক্ষার জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। করপোরেশনের প্রাধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ুন কবির ও ওয়াসা’র সহকারী প্রকৌশলী ইফতেখারুল্লাহ মামুন। সুত্র : আজাদী