ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর: হতাশ অংশীজনরা

অনলাইন ডেস্ক । সিটিজিসান.কম

ঢাকা:
আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে স্বাক্ষর করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই বহুল আলোচিত আইনটি গতকাল থেকেই কার্যকর হলো। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করায় সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীসহ অংশীজনরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস সত্ত্বেও এ আইনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে আলোচনায় না বসায় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জানা গেছে, দশম জাতীয় সংসদের ২২তম অধিবেশনে ১৮টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটির খসড়া তৈরির সময়ই এর বিভিন্ন ধারার বিরোধিতা করে আসছিলেন সাংবাদিকরা। এটি সংসদে পাস হওয়ার পরও তাতে রাষ্ট্রপতিকে স্বাক্ষর না করার অনুরোধ জানানো হয় সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন মহল থেকে। সম্পাদক পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন এই বিল পাসের বিরোধিতা করে কর্মসূচিও দিয়েছিল। কিন্তু তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর অনুরোধে সেসব কর্মসূচি স্থগিত করে বৈঠক করেন তারা।

বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এই আইনের যে ৯টি ধারায় আপত্তি, এগুলোর বিষয়ে পরবর্তী মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হবে। এরপর আবার নেতাদের সঙ্গে তারা বৈঠক করবেন। কিন্তু মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে পরবর্তীতে কোনো আলোচনা হয়নি। এর আগেই গতকাল বিলটিতে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করায় এখন থেকে আইনটি কার্যকর হলো।

দৈনিক মানবজমিন প্রধান সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান চৌধুরী গতকাল বলেন, এ বিষয়ে কাল বা পরশু অর্থাৎ আজ মঙ্গলবার কিংবা কাল বুধবার সম্পাদক পরিষদের বৈঠক হবে। বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে এবং পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

জানা গেছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাস করা হয়। এ আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে সাংবাদিকদের আপত্তি থাকলেও তা আমলে নেয়নি সরকার। সম্পাদক পরিষদ এই আইনের ৮টি (৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ) ধারা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিল। সম্পাদক পরিষদ মনে করে, এসব ধারা বাক-স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা হতে পারে। এ ছাড়া ১০টি পশ্চিমা দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা এই আইনের ৪টি (২১, ২৮, ৩২ ও ২৫) ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ৯টি ধারা (৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৮) পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিল।

আরও জানা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় এ দেশে প্রায় ৭০০ মামলা হয়েছে। ওই ৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে সাংবাদিক সমাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হয়েছিল।

বর্তমান ডিজিটাল আইনের চারটি (২৫, ২৮, ২৯, ৩১) ধারায় ভাগ করে ওই ৫৭ ধারা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইনটির খসড়ায় প্রথম যখন এটি করা হয়েছিল, তখন এই জাজ্বল্যমান প্রতারণার বিরুদ্ধে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, বিদেশি কূটনীতিকরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। সরকার তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে, তাদের আপত্তি বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু শেষমেশ ৫৭ ধারা ভেঙে ভেঙে, কিছুটা নতুন শব্দচয়ন করে, ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা শাস্তি কমিয়ে, প্রায় অবিকলভাবে নতুন ডিজিটাল আইনের বিভিন্ন ধারায় রেখে দেওয়া হয়েছে।

বিলের ৮নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ, ক্ষেত্রমত ব্লক করার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবেন।’

একই ধারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জনশৃঙ্খলা রক্ষায় মহাপরিচালকের মাধ্যমে একইভাবে তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনের এ ধারায় সরকারকে অবহিত করে বিটিআরসিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত অনুরোধ কার্যকর করার সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

২১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা ও প্রচারণা চালান বা তাতে মদদ দেন, তাহলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বার বার সংঘটিত করেন, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা তিন কোটি টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

২৫নং ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যা আক্রমণাত্মক বা ভীতিপ্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্ত বা হেয়প্রতিপন্ন করার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন বা (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তিনি তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

২৮ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধে আঘাত করে, তাহলে তিনি ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

২৯ ধারায় বলা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত মানহানিকর কোনো তথ্য প্রচার বা প্রকাশ করেন, তাহলে তিনি ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৩১নং ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটানোর উপক্রম হয়, তাহলে তিনি ৭ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৩২ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি (অফিশিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট ১৯২৩-এর আওতাভুক্ত) কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তিনি ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

সিএস/সিএম